শিরোনাম :
নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে মালয়েশিয়ার মসজিদগুলিতে প্যানেল চেয়ারম্যান আক্কাস সরদারকে হত্যাচেষ্টা মামলার ১৩ আসামী গ্রেপ্তার করোনা থেকে মুক্ত থাকতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে ঘরে বসে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা করতে হবে -টুক এমপি কেশবপুরে মেছো বাঘকে পিটিয়ে হত্যা পদ্মায় ভাঙ্গনের ২৪ ঘন্টায় ভাঙ্গন প্রতিরোধের ব্যবস্থা করলেন উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম সিরাজগঞ্জে নতুন করে ৩৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত পোরশায় ডাক্তারসহ আরও ৫ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বাংলাদেশে একদিনে আবারো চার হাজারের বেশি করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত বিএনপির বাজেট প্রত্যাখ্যান ঢামেক করোনা ইউনিটে দুইদিনে ১৬ জনের মৃত্যু
মুক্তিকামী মানুষের অনন্য অর্জন মহান স্বাধীনতা

মুক্তিকামী মানুষের অনন্য অর্জন মহান স্বাধীনতা

মোখলেসুর রহমান মাসুমঃ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতায় প্রাণ দিয়েছেন ৩০ লক্ষাধিক শহীদ। বাঙালি জাতির দুটি অর্জনের কারণে বাঙালির ইতিহাস বিশ্ব দরবারে পরিচিত। একটি মহান মাতৃভাষা বাংলা ভাষা রক্ষা, অপরটি মহান স্বাধীনতা। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ দেশ গঠনে লক্ষ লক্ষ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে ফজল-এ-খোদার রচিত ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি আজও মানুষকে শ্রদ্ধানবত হয়ে শহীদদের প্রতি স্মরণ করে।

ভয়াল কালরাত্রি’র পোড়া কাঠ, লাশ আর জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল জাতি। জ্বলে ওঠে মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ে তোলে প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ তীব্র স্লোগান তুলে ট্যাংকের সামনে এগিয়ে যায় সাহসী বুক। আজ থেকে ৪৭ বছর আগে পাক বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

ঘাতক পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ রাতে যখন ঢাকাসহ সারা পূর্ববাংলায় এক নৃশংস গণহত্যায় মেতে ওঠে, তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে নিজ বাসায় গ্রেফতার হওয়ার আগমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে একটি বার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি বলেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। একে যে রকম করেই হোক শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।’ ইপিআরের ওয়্যারলেস থেকে তাঁর এই বার্তা প্রচারিত হয়েছিল। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতারা মাইকে এটি প্রচার করেন। পরে চট্টগ্রামে অবস্থানরত বাঙালি সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা তাঁর পক্ষে বেতারে পাঠ করলে দেশবাসী স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার বিষয়টি আরো ভালভাবে জানতে পারে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলা শুরুর পরপরই দেশের বীর সন্তানেরা বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো যার যা আছে তা-ই নিয়ে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেয় বাঙালি। ৯ মাস মরণপণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় চিরকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা বীর সন্তানদের। এ বছর আমাদের মহান স্বাধীনতার ৪৮ বছর পদার্পনের শুভ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন বিশেষ মাত্রা যোগ হয়েছে। একই সাথে গত বছরের অক্টোবরে একাত্তরের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া সেই কালজয়ী ভাষণও ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যর স্বীকৃতি লাভ করে।

২৬ মার্চ, রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনার দিন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক দুঃশাসন আর শোষণ-বঞ্চনার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার দিন। ১৯৭১ সালে এই দিনে দেশকে হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করার ডাক এসেছিল। শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি শোষকের হাত থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে সেদিন থেকেই রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার দামাল ছেলেরা। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ মাস বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পরই মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণা তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেস থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেনÑ
পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্র“দের সাথে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। কোনো আপস নেই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্র“কে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন, জয় বাংলা।
২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা পাঠ করেন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার আগমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণার একটি লিখিত বাণী চট্টগ্রামের জহুর হোসেনসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র এ সময় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ২৬ মার্চ কালুরঘাট ট্রান্সমিশন সেন্টার থেকে সর্বশক্তি নিয়ে হানাদার বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। উল্লেখ্য যে, এ ঘোষণা প্রচারের সময় বেতার কেন্দ্রের নাম ছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র কিন্তু পরে বিপ্লবী শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এ বেতার কেন্দ্র থেকেই ২৭, ২৮ ও ৩০ মার্চ পর পর তিনটি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে স্বাধীনতার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, সেনা ছাউনিগুলোতেও।
হানাদারদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুর তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনামূলক উদাত্ত আহ্বানে গোটা জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে প্রত্যক্ষভাবে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বিকেল ৩টায় রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিব এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। দেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে শেখ মুজিবের এই ভাষণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রেসকোর্সের বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেন: এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি তখন রক্ত আরও দেব, দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবিলা করতে হবে।
ঐক্যবদ্ধ জনতা নেতার এ উদাত্ত আহ্বানকে স্বাগত জানায় এবং দেশের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারের প্রতিশ্র“তি দেয়।
এ ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে জনসভায় জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চূড়ান্ত স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংগ্রাম সূচনার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশে অসামরিক প্রশাসন চালু করার জন্য শেখ মুজিব ৩৫টি বিধি জারি করেন। অবস্থা খারাপ দেখে ঐদিন ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভবনে ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনার শুরুতে ইয়াহিয়া পূর্বে সংগঠিত সকল ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও আলোচনার গতি সন্তোষজনক না মনে করে তিনি টিক্কা খানকে কর্মপন্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। আলোচনার নামে ১০ দিন ধরে চলতে থাকে সময়ের অবক্ষয় ও প্রহসন। বলাবাহুল্য, এ সময় সামরিক বাহিনী সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। কড়া সামরিক প্রহরাধীনে ঢাকা বিমান বন্দরে ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে নতুন নতুন পাকিস্তানি সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র আনা হচ্ছিল। ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সহযোগীদের হাতে তুলে দেন খসড়া শাসনতন্ত্র। এই শাসনতন্ত্রে দ্বি-খণ্ডিত পাকিস্তানের কথা উল্লেখ ছিল।
ঢাকায় পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য চাপ দিতে থাকে। দেশের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিই শেখ মুজিবের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছিল এবং তিনি অখণ্ড পাকিস্তানের পরিবর্তে সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশের কথাই ভাবছিলেন।
১০ এপ্রিল সৈয়দ নজরুল ইসলামকে প্রেসিডেন্ট এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কর্নেল আতাউল গণি ওসমানীকে যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার, হত্যাযজ্ঞের মুখে বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তোলে প্রতিরক্ষা ব্যুহ। দেশের প্রায় এক কোটি লোক প্রাণের ভয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয় ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, চাকুরে, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের লোক। ক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ভয়াবহ রূপ লাভ করে। হানাদার বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসর্মপন করে। শত্র“মুক্ত হলো দেশ। জন্ম হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। তারপর থেকে প্রতিবছর দিনটি একটি স্মরণীয় দিবস হিসেবে জাতীয় মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে আসছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




কপিরাইট © ডেইলি আলোকিত সকাল - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত