দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা তিনবিঘা করিডোর মুক্ত দিবস

দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা তিনবিঘা করিডোর মুক্ত দিবস

মোঃ তৌহিদ আলম:  
 ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারত উপমহাদেশ ভেঙ্গে ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি দেশ ভাগের পর ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ২২৬৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দহগ্রাম ও আঙ্গোরপোতা ভূ-খন্ড পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পরিচিতি পায়। অতঃপর ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান অংশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এর নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। 
ভারতের ভিতরে থাকা দহগ্রাম আঙ্গারপোতা ওই সময় বাংলাদেশের রংপুর জেলার পাটগ্রাম থানার কুচলিবাড়ী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড ছিল। এরপর সেনা প্রধান সাবেক রাষ্ট্রপতিও জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ১৯৮৪ সালে দহগ্রাম ইউনিয়ন ঘোষনা করে সেখানে ভারতের অনুমতি সাপেক্ষ কয়েকবার নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেন ও বাংলাদেশ আইন কানুন চালু করেন।
সেখানকার বাসিন্দারা দীর্ঘ ৪৫ বছর অবরুদ্ধ জীবনযাপনের পর ৭৪-এর মুজিব -ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী পঞ্চগড় জেলার বেরুবাড়ী, যা ভারতের জলপাইগুড়ী জেলা শহর লাগোয়া সিটমহলের বিনিময়ে ১৯৯২ সালের ২৬ জুন তিনবিঘা করিডোর গেট চালু হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ওইদিন করিডোর উদ্বোধন করেন।ওই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসিমা রাও।
রেশনিং প্রথায় এক ঘণ্টা পর পর দিনের ১২ ঘণ্টায় ছয় ঘণ্টার জন্য খুলে দেওয়া হত। এরপর সময় বাড়িয়ে ২ ঘন্টা পর পর,তারপর ৬ ঘন্টা পরপর, অতঃপর ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেস্টায় সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টার জন্য ভারত নিয়ন্ত্রিত তিনবিঘা করিডোর গেটটি দিনের বেলা খোলা থাকত।
পঞ্চম ধাপে ২০১১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় হাসিনা-মনমোহন বৈঠকের পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর  থেকে তিনবিঘা করিডোর গেট ২৪ ঘণ্টা খুলে দেওয়া হয়। এরপর একই বছরের ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনবিঘা করিডোর গেট আনুষ্ঠানিকভাবে ২৪ ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত ঘোষনা দেন।
১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯২ সালের ২৬ জুন তিনবিঘা করিডোর খোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন লোকালয় ‘দহগ্রাম ইউনিয়নের দু’টি মৌজা দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা’র প্রায় ২০ হাজার মানুষ স্বাধীনতা লাভ করেন।
২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দহগ্রামের ছেলে মেয়েদের জন্য দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়,৪ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১০ শয্যার দহগ্রাম আঙ্গারপোতা হাসপাতাল,বাংলাদেশ থেকে তিনবিঘা আন্ডারগ্রাউন্ড বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ,দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্থাপনার উদ্বোধন ঘোষনা করেন।
দীর্ঘ বন্দি জীবনের মুক্তির আনন্দের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের সুদৃষ্টি পেয়ে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে দহগ্রাম আঙ্গরপোতার সহজ সরল বিভিন্ন পেশাজীবি শ্রমজীবি মানুষ। বর্তমানে যাতায়াত থেকে শুরু করে সকল নাগরিক সুবিধা পেয়ে বেশ আনন্দিত এখানকার সাধারণ মানুষ।
দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের জরিপ মতে,বর্তমানে ১৮৬৮ হেক্টর জমির দহগ্রাম আঙ্গরপোতায় ৩ হাজার পরিবারে বসবাস করে ২০ হাজার মানুষ।
এ পর্যন্ত যতগুলো সরকারি স্থাপনা তারমধ্যে দহগ্রাম পুলিশ ফাঁড়ি থানা ১টি, বিজিবি বিওপি ক্যাম্প ২টি, ইউনিয়ন পরিষদ ১টি, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ১টি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬টি, দাখিল মাদরাসা ১টি, ফোরকানিয়া মাদরাসা ১টি, এবতেদায়ী মাদরাসা ১টি,সরকারি ১০ শয্যার হাসপাতাল ১টি,কমিউনিটি ক্লিনিক ২টি, মসজিদ ৩৫টি, মন্দির ১টি, পাকারাস্তা ১৫ কিঃমিঃ ও কাঁচারাস্তা ১০কিঃমিঃ।
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা খরস্রোতা তিস্তা নদী দহগ্রামের কোল ঘেষে বয়ে গেছে।তিস্তার সাথে সংযোগ সাঁকোয়া নামে অপর ১টি নদী ও একটি জলমহলসহ অনেক কিছু আছে দহগ্রামের বুক চিরে। বর্তমানে দহগ্রাম- আঙ্গরপোতায় শিক্ষিতের হার ৪০%।
দৈর্ঘ্য ১৭৮ ও  প্রস্থ ৮৫ মিটার তিনবিঘার জমিটুকু জন্য ভারতের কাছ থেকে করিডোর হিসেবে ৯৯ বছরের জন্য লিজ পেয়েছে বাংলাদেশ।এজন্য ভারতকে কর দিতে হয় ১ টাকা।
এ ব্যাপারে দহগ্রাম সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজা ও ইউপি চেয়ারম্যান কামাল হোসেন প্রধানের সঙ্গে কথা হলে তারা ৭৪-এর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিটি পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন কামনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দহগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের অংশ দহগ্রাম আঙ্গারপোতা ভারতের  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে দাবী করেছিলেন। ৭৪-এর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি দিল্লীতে বসে স্বাক্ষর হবার আগে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদসহ জাতীয় চার নেতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাই এয়ারে দহগ্রামের মাটি ও মানুষকে দেখতে আসেন। 
ওই সময়ের সংগ্রাম কমিটির সভাপতি মরহুম শামসুল হক প্রধান ও বর্তমান আ’লীগ সভাপতি সাফিউল ইসলাম বাবলু মেম্বরের বাবা মরহুম জহির উদ্দীনসহ এলাকার অনেকের সাথে কথা বলে মতামত নেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দহগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং সেন্টার ও পিপিই ছিল।
এ কারণে বঙ্গবন্ধু দহগ্রামবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশ্বস্থ করে বলেন,ভারত চাইলেও তা দেয়া হবে না।ওইসময় বঙ্গবন্ধু বলেন,দহগ্রামের মাটি ও মানুষ বাংলাদেশের হার্ট অব পার্ট। তিনি আরও বলেন,দহগ্রাম আঙ্গারপোতা পকেটে নিয়ে দিল্লীতে বৈঠক করব কিন্তু এটি থাকবে আমার হৃদয়ে ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




কপিরাইট © ডেইলি আলোকিত সকাল - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত